সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে আসছে আইন, মেসেজের উৎস জানাতে হবে সংস্থাগুলিকে

এমন আইন আসছে, যাতে ভারতীয় কোনও গোয়েন্দা সংস্থা চাইলে সংশ্লিষ্ট ইউজারের তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে সংস্থাগুলি। তাতে কোনও ওয়ারেন্ট বা আদালতের নির্দেশও প্রয়োজন পড়বে না।

64

সোশ্যাল মিডিয়ায় বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ফেক নিউজ, গুজব, পর্নোগ্রাফি, সন্ত্রাসবাদ— ছড়ানোতে লাগাম পরাতে চেষ্টার কসুর করেনি ভারত সরকার। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলি ইউজারদের নিরাপত্তার অজুহাতে আপত্তি করেই চলেছে। কিন্তু এ বার হয়তো তার শেষ হতে চলেছে। এমন আইন আসছে, যাতে ভারতীয় কোনও গোয়েন্দা সংস্থা চাইলে সংশ্লিষ্ট ইউজারের তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে সংস্থাগুলি। তাতে কোনও ওয়ারেন্ট বা আদালতের নির্দেশও প্রয়োজন পড়বে না। এই মাসের শেষের দিকেই কার্যকরী হতে পারে সেই আইন।

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। ওই সময় এ নিয়ে অনলাইনে সাধারণ মানুষের মতামত চায় সরকার। যদিও ওই সময় ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এই আইন সুপ্রিম কোর্টের ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশ লঙ্ঘন করা হবে। ফেসবুক, অ্যামাজন, অ্যালফাবেটের মতো সংস্থা এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য।

কিন্তু সেই আপত্তিতে কান না দিয়ে সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এ মাসের শেষের দিকেই সেই আইন কার্যকরী হতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক সূত্রে খবর। মন্ত্রকের মিডিয়া উপদেষ্টা এন এন কলও বলেছেন, ‘‘গাইডলাইন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। তবে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’’

কী রয়েছে সেই আইনে? ২০১৮ সালের ওই প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছিল, ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, বাইট ড্যান্স, টিকটকের মতো অ্যাপে কোনও পোস্ট সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দারা তথ্য চাইলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তার উৎস, অর্থাৎ প্রথম কে পোস্ট বা শেয়ার করেছিল, সেটা জানাতে হবে। এই সব সংস্থাগুলিকে অন্তত ১৮০ দিন অর্থাৎ ৬ মাসের সব তথ্য রাখতে হবে, যাতে তদন্তের প্রয়োজনে সেগুলি উদ্ধার করা যায়। এর পাশাপাশি এক জন গ্রিভান্স অফিসার নিয়োগ করতে হবে, যিনি ইউজারদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন এবং ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলি ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করবেন। এখন সেই আইনই কার্যকর করতে চলেছে ভারত সরকার। তাতে বিশেষ কিছু পরিবর্তনও করা হবে না বলেও মন্ত্রকের এক কর্তা জানিয়েছেন।

কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের মূল সংস্থা ফেসবুক গোড়া থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে। তাদের বক্তব্য, হোয়াটসঅ্যাপে সব কিছুতেই এন্ড টু এন্ড সাবস্ক্রিপশন প্রযুক্তি রয়েছে। যার অর্থ, শুধুমাত্র দুই প্রান্তের দু’জন ব্যবহারকারীই তাদের মধ্যে আদানপ্রদান করা কল, মেসেজ, ছবি বা ভিডিয়োর তথ্য পাবেন। তৃতীয় কোনও ব্যক্তি, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষও সেগুলির তথ্য পাবে না। ভারত সরকারের এই আইন মানলে গ্রাহকদের সেই সুরক্ষা বিঘ্নিত হবে।

বুধবারও সংস্থার তরফে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার সঙ্গে কখনওই হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ আপস করবে না। বরং কী ভাবে তাঁদের সুরক্ষা আরও বেশি সুনিশ্চিত করা যায়, তার জন্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার সাহায্য নিয়ে এর অপব্যবহার রোখার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রেখে অভিযোগ জানানো বা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কাজ করা হবে।’’

কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে আইন চালু হলে সেটা না মেনে আর কোনও উপায় থাকবে না সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির। আইন মানতে বাধ্য হবে। তবে বিদেশি ব্যবহারকারীরাও এই আইনের আওতায় আসবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ, পর্নোগ্রাফি, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, সন্ত্রাসবাদ, জাতি হিংসা ছড়ানো কী ভাবে আটকানো যায়, তা অন্যতম মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। সংস্থাগুলি সহযোগিতা না করলে যে সেটা সম্ভব নয়, সেটাও স্পষ্ট। কিন্তু সেই অধিকাংশ সংস্থাই বেঁকে বসায় সেই নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হচ্ছে না।

ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে সেই প্রবণতা আরও ভয়ঙ্কর। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে গুজবের জেরে গণপিটুনির ঘটনা আকছার ঘটে। সরকারি হিসেবে ২০১৭-১৮ সালের মধ্যেই এই ধরনের গণপিটুনিতে মৃতের সংখ্যা ৩৫-এরও বেশি। সেখানে ভারতে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি হয়ে পড়েছে বলেই মত কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের কর্তাদের। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির অসহযোগিতায় কার্যত হতাশ তাঁরা। আইন কার্যকর হলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই সব গুজব-ফেক নিউজ অনেকটাই আটকানো সম্ভব হবে বলেই মত তাঁদের। তবে মোজিলা, উইকিপিডিয়ার মতো ব্রাউজার বা তথ্য সম্বলিত সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকরী হবে না বলেই জানিয়েছেন মন্ত্রকের পদস্থ কর্তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here